Breaking News
Home / সাম্প্রতিক খবর / করোনার প্রভাবে নিত্য পণ্যের মূল্য বৃদ্ধির হিড়িক এ যেন আরেক মহামারী- মুহাম্মদ জামাল উদ্দীন রব্বানী

করোনার প্রভাবে নিত্য পণ্যের মূল্য বৃদ্ধির হিড়িক এ যেন আরেক মহামারী- মুহাম্মদ জামাল উদ্দীন রব্বানী

করোনার প্রভাবে নিত্য পণ্যের মূল্য বৃদ্ধির হিড়িক এ যেন আরেক মহামা-
মুহাম্মদ জামাল উদ্দীন রব্বানী

কোভিড-১৯। যা করোনা ভাইরাস হিসেবে পরিচিত। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে চীনের হুবেই প্রদেশের শহর উহান থেকেই সর্বপ্রথম এই মরণঘাতি সংক্রামক ভাইরাসটি মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। যা চীন পেরিয়ে এখন বিশে^র ১৯৫ টি দেশে মহামারী আকার ধারণ করেছে। বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এই সংক্রামক ভাইরাসকে বৈশি^ক মহামারী হিসেবে ঘোষণা করেছে। এই ভাইরাসে সংক্রমিত হয়ে চীন, ইতালি, স্পেন, আমেরিকা, জার্মানী, ইরানসহ বিশে^র বিভিন্ন দেশে আজকের দিন পর্যন্ত প্রায় কুড়ি হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। আক্রান্ত হয়েছে সাড়ে ৪ লাখেরও বেশি। মানুষে মানুষে ছড়িয়ে পড়া এই ভাইরাসের কোন প্রতিষেধক এখনো আবিস্কার করতে পারেনি বিজ্ঞানীরা। ফলে এই সংক্রামক ভাইরাস ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। আতঙ্কের বিষয় হচ্ছে, অর্থনৈতিক ও স্বাস্থ্য সেবার দিক দিয়ে বিশে^র উন্নত দেশগুলোতে যেখানে মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে, আক্রান্তের সংখ্যাও হু হু করে বাড়ছে, সেখানে উন্নয়নশীল দেশ হিসাবে অনেক পিছিয়ে থাকা বাংলাদেশের পরিস্থিতি কেমন হবে। এমন শঙ্কার মধ্যেই গত ৮ মার্চ ২০২০ খ্রীষ্টাব্দে বাংলাদেশে প্রথম করোনাক্রান্ত রোগী শনাক্ত করে আইইডিসিআর। তার মানে আমাদের দেশেও ঢুকে পড়েছে করোনা।
স্বাভাবিক ভাবে এই ভাইরাস থেকে বাঁচতে আক্রান্ত ব্যক্তির ‘কোয়ারান্টাইন’ এ থাকা এক প্রকার বাধ্যতামূলক। আর আক্রান্ত ব্যক্তিদের থেকে অন্যদের বাঁচাতে সতর্কতামূলক সবাইকে নিজ নিজ বাসস্থলে অবস্থান করাও কার্যকর একটি পদ্ধতি। যে জন্য দেশে দেশে সরকারগুলো আক্রান্ত এলাকা ‘লকডাউন’ করাসহ নানা কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তারই ধারাবাহিকতায় আমাদের দেশের সরকারও লকডাউনের দিকে এগুচ্ছে। লকডাউন মানে অবরুদ্ধ জীবন-যাপন। ‘করোনা’ মহামারীর চেয়ে এই ‘লকডাউন’ যেন হঠাৎ আরো বড় মহামারী হিসেবে দেখা দিয়েছে দেশের মানুষের কাছে। অবরুদ্ধ জীবনে মানুষ খাবে কি, বাঁচবে কেমন করে সেটাই যেন প্রধান সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। তাইতো একদিকে ধনী ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের মধ্যে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য-সামগ্রী মজুদ করার প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে, অন্যদিকে সেই সুযোগে আসাধু ব্যবসায়ীদের মধ্যে মূল্য বৃদ্ধির হিড়িক পড়েছে। মজুদ করা আর মূল্য বৃদ্ধি করার এই প্রবণতার মাঝে বড় শঙ্কা হয়ে দেখা দিয়েছে দেশের সংখ্যা গরিষ্ট দরিদ্র জনগোষ্ঠির বেঁচে থাকা। করোনায় আক্রান্ত হয়ে মরার শঙ্কার চেয়েও তাদের মধ্যে এখন না খেয়ে মরার শঙ্কা অনেক বড় করে দেখা দিয়েছে। করোনার পর এটা যেন তাদের জন্য আরেক মহামারী।
সরকার বিষয়টা আঁচ করতে পেরেছে বলে মনে হয়। তাই বাজারে বাজারে ভ্রাম্যমান ম্যাজিস্টেট ও ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদপ্তরের টিম অসাধু ব্যবসায়ীদের শাস্তির আওতার আনার চেষ্টা চালাচ্ছে এবং জনসাধারণকেও অতিরিক্ত পণ্য ক্রয় না করতে বুঝানোর চেষ্টা করছে। তবে বাজার অনুপাতে তা যথেষ্ট বলে মনে হচ্ছে না। সত্যিকার অর্থে, শুধু বাজার মনিটরিং করেও তা নিয়ন্ত্রণ করা বা জনসাধারণকে সচেতন করা সম্ভব নয়, যতক্ষণ পর্যন্ত দেশের ব্যবসায়ী ও জনগণের মধ্যে নীতি-নৈতিকতাবোধ জাগ্রত না হবে। সেনাবাহিনী নেমে গেলে হয়তো পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হতে পারে।
সর্বশেষ বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো’র তথ্য মতে দেশে দারিদ্রতার হার ২০.৫ এবং হত দরিদ্রের হার ১০.৫ শতাংশ। আর দেশে মোট জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৪৬ লাখ। সে হিসেবে প্রায় সোয়া তিন কোটি মানুষ দরিদ্রসীমার নিচে বসবাস করছে। যদিও প্রকৃত তথ্য ভিন্ন বলে মনে হয়। তবুও এই জনগোষ্ঠির কথা বিবেচনা করলেও উৎকন্ঠিত না হয়ে পারা যায় না। একদিকে দারিদ্রতা অন্যদিকে স্বাস্থ্য সচেতনতায় পিছিয়ে আমরা। করোনার মরণব্যাধি একবার তাদের মধ্যে ঢুকে পড়লে কী করুণ অবস্থায় না হবে! না পাবে খেতে, না পাবে চিকিৎসা নিতে।
যদিওবা করোনায় মৃত্যুর হার ৩.৪ শতাংশ বলা হচ্ছে বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থার পক্ষ থেকে। প্রথম দিকে চীনে তা ছিল ২ শতাংশে। ইতালিতে এই হার বেড়ে হয় ২.৮ শতাংশে। আর এখন বিশ^ব্যাপি যেভাবে মৃত্যুর মিছিল বেড়ে চলছে তাতে ৩.৪ শতাংশ থেকে বেড়ে যাবে না তা বলা যাচ্ছে না। বিশেষ করে, উন্নত বিশ^ যেখানে সব সুবিধা নিয়েও বেঁচে থাকার লড়াইয়ে প্রতি নিয়ত হেরে চলেছে তাতে এ আশংকা উড়িয়ে দেয়া যায় না।
সরকার দেশের দরিদ্রদেরকে নোয়াখালির ভাসান চরে যাওয়ার কথা বলছে। যেখানে তাদের জন্য থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে, কত জনকে খাওয়াবে। যা শুনেছি তাতে ওখানে মাত্র ১ লাখ লোকের জায়গা হবে। সোয়া তিন কোটির বাকির জন্য কী ব্যবস্থা হবে? এ পরিস্থিতি যদি আগামী দুই থেকে তিন মাস চলে, তাহলে মধ্যবিত্ত শ্রেণি যারা ছোট খাটো প্রাইভেট চাকরি বা অন্যান্য কাজ-কর্ম করে জীবিকা নির্বাহ করে, তাদের কী অবস্থা হবে? শুনা যাচ্ছে, অনেকে এই চাকরীও হারাতে পারেন। তাহলে তো ‘মড়ার উপর খাড়ার গা’র মতোই হবে। আসলে করোনার এ লড়াই শুধু করোনা আক্রান্ত হবার ভয়ে সীমাবদ্ধ নেই, ভয় কোন রকম খেয়ে-পরে বেঁচের থাকারও।
কানাডা সরকার দেশের সকল জনগোষ্ঠিকে আশ^স্ত করতে পেরেছে এই বলে যে, প্রত্যেকের ঘরে ঘরে প্রয়োজনীয় খাবার-দাবার পৌঁছে দেবে তারা। আমাদের কি তা সম্ভব? সম্ভব নয় তা আমরা সকলেই জানি। সুতরাং করোনার এ লড়াই শুধু সরকারের একার নয়, আমাদের সকলের। এটা আমাদের বুঝতে হবে। বেশি করে বুঝতে ব্যবসায়ীদের। করোনায় আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা সেবা পায় বা না পায়, অন্তত বেঁচে থাকা পর্যন্ত কিছু খাবার-দাবার যেন পায়।
তাই, ব্যবসায়ী ভাইদের অধিক মুনাফা না করে দ্রব্যমূল্যের দাম সাধারণ জনগণের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে রাখা উচিৎ । আর ধনী ও মধ্যবিত্ত জনগণেরও বুঝা উচিত, টাকা আছে বলে শুধু তারাই অগ্রিম দুই তিন মাসের খাবার মজুত করে রাখবে, বাকী জনগোষ্ঠিরা খাবে কি? এই নৈতিকতাবোধ না থাকলে আমরা মানুষ হিসেবে পরিচয় দিয়ে লাভটা কি।
সংখ্যাগরিষ্ট মুসলমানের এদেশে তা অত্যন্ত বেমানান। কারণ ইসলামের নবী হযরত মুহামম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “পণ্যদ্রব্য আটক করে অধিক মূল্যে বিক্রয়কারী অবশ্যই পাপী”(মুসলিম শরীফ)। অন্যত্র তিনি বলেছেন, “মজুতদার ব্যক্তি খুবই নিকৃষ্টতম ব্যক্তি। যদি জিনিসপত্রের দর হ্রাস পায়, তবে তারা চিন্তিত হয়ে পড়ে। আর যদি দর বেড়ে যায়, তবে আনন্দিত হয়”(বায়হাকী)।
ইবনে মাজাহ ও বায়হাকী শরীফে উল্লেখ আছে, “কেউ যদি মুসলমানদের থেকে নিজেদের খাদ্যশস্য আটকিয়ে রাখে (মজুতদারী করে) তবে আল্লাহ তা’আলা তার উপর মহামারী ও দারিদ্রতা চাপিয়ে দেন”। সুতরাং করোনার ভয়াবহ এই মহামারীতে নিত্য পণ্যের মজুতদারী বা অহেতুক মূল্যবৃদ্ধিকারীরা আমাদের জন্য আরেকটি মহামারীই যেন ডেকে আনছেন। আল্লাহ আমাদের সবাইকে বুঝার তওফিক দান করুক। আমিন।

Check Also

করোনা আক্রান্ত প্রতিটি মানুষের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করুন : ডা. মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন

করোনা আক্রান্ত প্রতিটি মানুষের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করুন : ডা. মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন উপসম্পাদকীয় : যাপিত …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *