Breaking News
Home / জানা অজানা / বিসিএস নিয়ে বিতর্ক ও প্রাসঙ্গিক কিছু কথা

বিসিএস নিয়ে বিতর্ক ও প্রাসঙ্গিক কিছু কথা

বিসিএস নিয়ে বিতর্ক ও প্রাসঙ্গিক কিছু কথা!
সর্বশেষ ৩৮তম বিসিএস এর ফলাফলকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঝড় বয়ে যাচ্ছে। নানা মানুষের নানা মত ও বিভিন্ন বিষয়ে যৌক্তিক ও অযৌক্তিক বিতর্কে সকলের ফেইসবুক নিউজফিড পরিপূর্ণ। এ সংক্রান্ত বিভিন্ন আবেগী লেখাও চোখে পড়েছে। তবে বেশিরভাগ লেখা ভাবাবেগ দোষে দুষ্ট বা অনুমান নির্ভর। আসলে বিতর্ক হচ্ছে দুটি বিষয় নিয়ে। প্রথমত এত এত প্রার্থী কেন বিসিএস পরীক্ষায় অংশগ্রহন করছে? দ্বিতীয়ত কেন এত ডাক্তার বা প্রকৌশলী সাধারণ ক্যাডারে আসছে?
প্রথম প্রশ্নের উক্তরে আমি কিছু তথ্যের উপস্থান করতে চাই। এই ক্ষেত্রে আমি ভারত বা পাকিস্তানের উদাহরণ না টেনে চীন ও দক্ষিণ কোরিয়া এর উদাহরণ টানবো। চীন এর সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা মান্দারিন ভাষায় হয় “Guako” এই পরীক্ষার মাধ্যমে ৮৬টি কেন্দ্রীয় সংস্থা ও ২৩ টি সংযুক্ত দপ্তরের নিয়োগ অনুষ্ঠিত হয়। ২০১৮ সালের নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করে ১.৪৪ মিলিয়ন পরীক্ষার্থী। চায়নায় সিভিল সার্ভিসের চাকরিকে “Iron Rice Bowl” বলা হয়। চাকরির নিরাপত্তা ও উচ্চ বেতনের জন্য এই সকল চাকরিকে এই নামকরণ করা হয়েছে। পরীক্ষার বিষয়বস্তু ঠিক অনেকটা আমাদের মতই। যেমন: চাইনিজ অ্যাফেয়ার্স, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, গাণিতিক যুক্তি, প্রভৃতি। ২০১৮ সালে ২৪,০০০ পদের বিপরীতে পরীক্ষা দেয় প্রায় ১.৪ মিলিয়ন। অর্থ্যাৎ প্রতি ৬০ জনে ১ জন নিয়োগ পাওয়ার সুযোগ থাকে।
দক্ষিণ কোরিয়ায় সরকারি চাকরি পাওয়ার ইচ্ছা আরও প্রবল। এই করোনার সময়েও প্রায় ১ লাক্ষ ৯২ হাজার চাকরি প্রত্যাশী কোরিয়ান সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার জন্য বসেছে। এক জরিপে দেখা যায়, কোরিয়ায় প্রায় প্রতি ৪ জনে ১ জন সরকারি চাকরির প্রতি আগ্রহী। সুতরাং সরকারি চাকরির প্রতি আগ্রহ শুধু আমাদের দেশেই নয় বিশ্বের অনেক দেশেই রয়েছে। এর কারণ হিসাবে সরকারি চাকরির নিশ্চয়তা, চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের ফলে চাকরি হারানোর ভয়, সামাজিক চাপ বা ব্যক্তিগত ইচ্ছাও রয়েছে। সুতরাং কেন এত প্রার্থী সরকারি চাকরির পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে তা নিয়ে এত চুলচেরা বিশ্লেষণ অপ্রয়োজনীয়। দ্বিতীয় প্রশ্বের উত্তরে যাওয়ার পূর্বেই আমি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সংবিধানের ৪০ অনুচ্ছেদ সকলকে পড়ার জন্য অনুরোধ করব। বাংলাদেশের সংবিধান প্রত্যেক নাগরিককে তার ইচ্ছা মাফিক বৈধ কোন পেশা নির্বাচনের অধিকার দিয়েছে।
সুতরাং ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়াররা কেন সাধারণ ক্যাডারে আসছে এই প্রশ্নই অবান্তর। এখন আমি এই প্রশ্নটির উত্তর দিতে যুক্তরাষ্ট্রের ফরেন সার্ভিস যা স্টেট ডিপার্টমেন্ট নামে খ্যাত তার উদাহরণ দিচ্ছি। স্টেট ডিপার্টমেন্ট প্রবেশের ক্ষেত্রে সকল পরীক্ষার্থিকে “FSOT” পরীক্ষা দিতে হয়।“FSOT” বা Foreign Service officer Test নামক পরীক্ষাটিতে অংশগ্রহণেরর জন্য কোন বিষয় এর বাধ্যবাধকতা এমনকি নূনতম কোন শিক্ষাগত যোগ্যতার কখনও উল্লেখ থাকেনা। যুক্তরাষ্ট্রে জিওলজি, ইঞ্জিনিয়ারিং বা অর্থনীতির অনেক ছাত্রও যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত হয়েছেন। এতে যুক্তরাষ্ট্রের ফরেন সার্ভিসের মান কমছে বলে শোনা যায়নি। আমাদের দেশে টেকনিক্যাল বিষয় থেকে জেনারেল সার্ভিসে আসার ট্রেন্ডকে স্বাগত জানানো উচিত। কারণ জেনারেলিস্ট সার্ভিসে এই টেকনিক্যাল বিষয়সমূহ থেকে আসা গ্র্যাজুয়েটরাই চতুর্থ শিল্প বিপ্লব এর সময় দেশকে পথ দেখাবে।আবার প্রত্যেক পেশার আলাদা ডাইমেনশন ও স্কোপ আছে। প্রকৃতপক্ষে বিশ্বের প্রায় সকল সিভিল সার্ভিসেই জেনারেলিস্টদের একটু দাপট থাকেই।
উদাহরণ হিসাবে Singapore Administrative Service এর উদাহরন দেয়া যায়। সিঙ্গাপুর এর প্রায় ১৫ টি মন্ত্রণালয় ও ৫০টি বোর্ডের প্রধান হচ্ছেন এই সার্ভিসের সদস্যরা। এই সার্ভিসের সুযোগ সুবিধা ও বেতন সবই বেশ অকর্ষণীয়। কিছুদিন আগ পর্যন্ত সিঙ্গাপুর এর আইন সচিব ছিলেন একজন ইঞ্জিনিয়ার । সিভিল সার্ভিসের নতুন ধারনা হচ্ছে টেকনিক্যাল সেবাসমূহকে বেসরকারিকরণ বা পদভিত্তিক বা প্রজেক্টের ভিত্তিতে টেকনিক্যাল লোকজন নিয়োগ প্রদান । সিভিল সার্ভিস এর মূল কাজ হচ্ছে তদারকি ও ব্যবস্থপনা। বাংলাদেশ এর মত খুব কম দেশই আছে যারা সরাসরি জনগনকে এত সরকারি সেবা দেয়। যেমন: বিদ্যুৎ বা পানির সরবরাহ যুক্তরাষ্ট্রে বেশিরভাগ স্টেটেই বেসরকারি প্রতিষ্ঠান প্রদান করেন। সুতরাং যতদিন যাবে সিভিল সার্ভিস এর ভূমিকা বিশেষত টেকনিক্যাল সার্ভিসসমুহ এর পরিসর সীমিত হবে।
সতুরাং জেনারেল ক্যাডারসমুহতে ইঞ্জিনিয়ার বা ডাক্তারদের আগমন ভবিষ্যতে আরও বাড়তে পারে। আরেকটি কথা সেটি হচ্ছে আমাদের সমাজে বিসিএস ক্যাডার হওয়ার জন্য যেমন চাপ দেয় ঠিক তেমনই ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার জন্য চাপ দেয়। আবার আমাদের অনেেক চাকরি বা অর্থের জন্য এইসকল বিষয় বেছে নেয়। সতরাং কত শতাংশ ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার তার নিজ পেশাকে ভালোবাসে এটাও একটি প্রশ্ন। সুতরাং বিসিএস এ ডাক্তার প্রকৌশলীদের আসা নিয়ে যে অযাচিত বিতর্ক হচ্ছে তা বন্ধ করা উচিত।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিসিএস এর ফলাফল নিয়ে মতামাতি যেমন দৃষ্টিকটু ঠিক তেমনি বিসিএস বিরোধী পোস্টও একই রকম অসুন্দরের সৃষ্টি করে। প্রকৃতপক্ষে আমাদের দেখা দরকার সঠিক সময়ে সঠিক ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং এবং সামাজিক চাপ এর বিপরীতে ব্যক্তির ইচ্ছাকে প্রাধান্য পাচ্ছে কিনা? এই দুইটি প্রশ্নের সমাধান করতে পারলেই আর আমাদের এই বিষয় নিয়ে আর সময় নষ্ট করতে হবেনা।
লেখকঃ কে এম ইসমাম
সহকারী কমশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন।

Check Also

আত্মবিশ্বাসীরাই বিজয়ী অবিশ্বাসীরা পরাজিত -ড. মাসুম চোধুরী

আত্মবিশ্বাসীরাই বিজয়ী অবিশ্বাসীরা পরাজিত -ড. মাসুম চোধুরী মানুষ এখন পা দিয়ে হাটে না, মাথা দিয়ে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *