Breaking News
Home / এক্সক্লুসিভ / করোনা কালে সমাজের অমানবিকতা এবং মধ্যবিত্তের আহাজারি- মোঃ নাজমুল ইসলাম পিন্টু

করোনা কালে সমাজের অমানবিকতা এবং মধ্যবিত্তের আহাজারি- মোঃ নাজমুল ইসলাম পিন্টু

করোনা কালে সমাজের অমানবিকতা এবং মধ্যবিত্তের আহাজারি-
মোঃ নাজমুল ইসলাম পিন্টু

করোনা নামের অপরিচিত যুদ্ধে হেরে, ভাঙ্গা মন নিয়ে, নিঃস্ব হাতে প্রতিদিন হাজারো পরিবার চলে যাচ্ছে তার স্বপ্ন শহর ঢাকা ছেড়ে। প্রতিটা পরিবারের অনিশ্চয়তায় ভরা চিন্তায় হয়তো একটা কথাই ঘোরে, “স্বপ্ন কী ছিল, কী হলো”?

গত মার্চ মাসে বাংলাদেশে প্রথম করোনা রোগী সনাক্ত হওয়ার পর থেকে আমাদের দেশেও প্রতিদিন আক্রান্ত এবং মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। সরকার ঘোষিত সাধারণ ছুটির মেয়াদ কয়েক দফা বাড়িয়ে এখনো চলছে। মানুষের জীবন- জীবিকা বলতে গেলে একপ্রকারে স্থিতাবস্থা। এই ভয়ংকর মহামারির মধ্যে যারা সু-স্বাস্থ্য নিয়ে বেঁচে আছেন, অর্থনৈতিক সংকটে তাদের অধিকাংশের অবস্থাও নাজুক। বিত্তবানরা ঘরবন্দি হয়ে জীবনযাপনে সমর্থ হলেও, সীমিত আয়ের নিম্নবিত্ত, অসহায় ও দুঃস্ত মানুষগুলোর পাশাপাশি মধ্যবিত্তরাও আছেন ভীষণ বিপদে। দীর্ঘদিনের লডডাউনে কর্মহীন অবস্থায় থাকায়, অনেকের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায়, অনেকে অর্ধেক বেতন পাওয়াই কিংবা চাকরিচ্যুত হওয়াই জীবনধারণ করাই এখন তাদের জন্য দিনেদিনে অসম্ভব হয়ে উঠছে। চরম অর্থনৈতিক এই সংকটের মধ্যে নগরবাসীর বাসা ভাড়া, গ্যাস বিল, বিদ্যুৎ বিল, পানি বিল, নেট বিল, ডিস লাইনের বিল পরিশোধের এ জাতীয় উদ্বেগের সাথে পারিবারিক কলহ, সন্তানসন্ততির অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ চিন্তা সবমিলিয়ে দুর্বিষহ করে তুলছে বেঁচে থাকার স্বাদ। নগরবাসীর উপর সরকার নিয়ন্ত্রিত বিভিন্ন সেবার বিল পরিশোধের আপাতত চাপ না থাকলেও বাসা ভাড়া পরিশোধের চাপ রয়েছে যথারীতি। এই চরম দুর্যোগকালেও বাড়ির মালিক ভাড়াটিয়ার কোন প্রকার সমস্যা শুনতে নারাজ! মহামারি করোনা ভাইরাসের ফলে সৃষ্ট এই সংকটে সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের পক্ষ থেকে নানা ধরনের সহযোগিতা করা হচ্ছে, তবে সেগুলোর সবই নিম্নআয়ের মানুষের জন্য। বিত্তবানদের তরফ থেকেও এ পর্যন্ত যে সাহায্য সহযোগিতা করা হয়েছে। মধ্যবিত্তদের অর্থ- বিত্ত না থাকলেও আত্মসম্মান খুবই স্পর্শকাতর ইস্যু, ফলে চরম দারিদ্র্যতার মাঝেও আত্মসম্মানের ভয়ে সরকারি রিলিফের খাতায় তারা কেউ নাম লেখাতে পারেন না। কেউ যদি চরম অসহায়ত্ব স্বীকার করে বাধ্য হয়ে দুঃস্থদের সাথে ত্রাণের লাইনে দাঁড়ান, আমাদের চারপাশ তা সহজে মেনে নিতে পারে না। বিভিন্ন ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়। এই হচ্ছে সমাজে মধ্যবিত্তের বাস্তব চিত্র।

গ্রামের রিক্সা চালকটি শহরে এসেছিল দুটো পয়সা রোজগার করে স্ত্রী সন্তান নিয়ে ডাল ভাত খেয়ে দিন পার করবে। কিন্তু করোসার প্রাদূর্ভাবে তারা আজ নিঃস্ব হয়ে পথে পথে ঘুরছে। আর মধ্যবিত্তদের কথা কি বলবো, মধ্যবিত্তদের ঘরে চাল না থাকলেও বুঝা যায়না যে তারা না খেয়ে আছে বা তারা কষ্টে আছে। এই মহামারির দিনেই স্বপ্নের শহর ছেড়ে অনেক মধ্যবিত্ত পরিবারই পারি জমাচ্ছেন গ্রামে। শহরে থাকলে প্রতিমাসে বাড়ি ভাড়া কোথা থেকে আসবে সেই চিন্তাধারায় স্বপ্ন ভঙ্গ করে চলে যেতে হচ্ছে। করোনা কালে বিত্তবানদের উচিত অসহায় মধ্যবিত্তদের পাশে দাড়ানো কিন্তু আমাদের চারপাশে কি ঘটছে?

করোনাকালে রাজধানীর ধানমন্ডির কাঠালবাগান এলাকায় সামান্য এক মাসের ভাড়া দিতে না পারায় ঝড়ের রাতে তিন শিশুসহ এক দম্পতিকে বাসা থেকে বের করে দিয়েছেন বাড়ির মালিক। আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হস্তক্ষেপেও বাড়ির মালিক দমে জাননি! বরগুনায় বাস চালক মোঃ ফারুক এক মাসের বাসা ভাড়া পরিশোধে ব্যর্থ হওয়াই তার ঘর থেকে রান্নার চাল নিয়ে গেছে বাড়ির মালিক! আবার বগুড়ায় ভাড়া দিতে না পারায় সরকারি আজিজুল হক কলেজের পাঁচ ছাত্রীকে আটকে রেখেছেন মেস মালিক। এমন অসংখ্য অমানবিক ও বিব্রতকর ঘটনা চারপাশে ঘটছে ; কিছু ঘটনা সামাজিক ও গণমাধ্যমের কল্যাণে জানা যাচ্ছে, এমন অনেক ঘটনাই থেকে যাচ্ছে সবার অগোচরে।

রাজধানীসহ বিভিন্ন শহরে যেসব ভাড়াটিয়া বসবাস করেন এদের অধিকাংশই মধ্যবিত্ত পরিবার। এদের অধিকাংশই হয়ত চাকরি, নয়তো ছোটখাটো ব্যবসা করেন। আবার শহরে আরেকটা শ্রেণীর মানুষ ভাড়া বাড়িতে বসবাস করেন যারা শহরের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ুয়া, নয়তো বেকার। এদের কোন শ্রেণীতে ফেলবো ঠিক বুঝতে পারছি না। উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত এসব যুবক- যুবতীর অনেকেই পার্ট- টাইম জব করে অথবা টিউশনি করে নিজের খরচ জোগানোর পাশাপাশি পরিবারকেও সহায়তা করেন। কিন্তু করোনাকালে তাদেরও সকল জীবিকার পথ বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে আর্থিক সংকটের কারণে অনেকেই বাসা বা মেস ছেড়ে গ্রামে ফিরে যাচ্ছেন। অনেকে নিরুপায় হয়ে হয়ত মেসের মাসিক বিল কিংবা বাসা ভাড়া দিতে অপারগ হচ্ছেন। কিন্তু তাই বলে তাদের বাসা থেকে অপমান করে বের করে দিতে হবে? এ কোন ধরনের অমানবিক আচরণ, এটা কোন ধরনের অসভ্যতা? এই মহামারির সময়েও যদি মানুষের মনুষ্যত্ব না জাগে তাহলে আর কবে জাগবে? অমানুষ থেকে মানুষ হয়ে উঠার এখনই তো উত্তম সুযোগ।

রাজধানীসহ অন্যান্য শহরগুলোতেও বাড়ির মালিকদের আচরণ অনেকাংশে কর্তৃত্ববাদী। বাসা ভাড়া দেয়ার পরও ভাড়াটিয়াদের জন্য বাড়ির মালিকদের হাজারটা অলিখিত নিয়ম। এছাড়া বছর শেষে কারণে- অকারণে বাসা ভাড়া বৃদ্ধির নির্ধারিত যন্ত্রণা তো আছেই। আর ব্যাচেলর হলে তো মরার উপর খড়ার ঘা। তবুও মানুষ একটু মাথা গুঁজার জন্য নিরুপায় হয়ে বাড়ির মালিকদের সকল অন্যায় আবদার নিরবে সহ্য করে। দেশে বাসা ভাড়া সংক্রান্ত আইন থাকলেও বাড়ির মালিক তা থোরায় কেয়ার করেন। ভাড়াটিয়াও আইনের আশ্রয়প্রার্থী হওয়া এক প্রকার ঝামেলা মনে করে বাসার মালিকের বিরুদ্ধতা না করে সব কিছু মেনে নিয়ে বসবাস করেন। কিন্তু বাড়ির মালিকদের এই নিরব অত্যাচার আর কতদিন চলবে? তবে এত অভিযোগের মাঝেও কিছু বাসার মালিক আছেন যারা খুব মানবিক এবং ভাড়াটিয়ার বিপদে পাশে দাঁড়ান।

অস্বীকার করবো না অনেক বাড়ির মালিকের পরিবার শুধু বাড়ি ভাড়ার ওপরেই নির্ভরশীল। তাদের অনেকেই ঋণ নিয়ে বাড়ি নির্মাণ করেছেন। ভাড়ার টাকা দিয়ে নিয়মিত ব্যাংকের কিস্তি পরিশোধ করেন। এমতাবস্থায় ঋণগ্রস্ত বাড়ির মালিকদের উপরও একটা অর্থনৈতিক চাপ আছে। কিন্তু তাই বলে কি তারা অমানবিক আচরণ করবে? আর অমানবিক আচরণ করলেই কি সমস্যার সমাধান হবে?

লেখকঃ মোটিভেশনাল স্পিকার ও কলামিস্ট

Check Also

জননেত্রী শেখ হাসিনা বরাবরে “খোলা চিঠি”- সৈয়দ নুরুল আবছার

জননেত্রী শেখ হাসিনা বরাবরে “খোলা চিঠি”- সৈয়দ নুরুল আবছার বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি, ১৮ কোটি …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *